গ্রামের বটগাছের তলায় দুরন্ত ছেলেরা গালে হাত দিয়ে চিন্তা করছে এমন সময় বালকদিগের সর্দার নিত্যানন্দ রায়ের মাথায় একটা ভাবনা উদয় হল। ‘ভূত চতুর্দশী রাতে একটা মাটির হাঁড়িতে সাদা রং করার পর সেই হাড়িতে দুখানা বড় বড় কালো চোখ এঁকে, গ্রামের যে রাস্তা দিয়ে প্রতিবছর লোকেরা ঘোষ বাড়ির এই কালী পুজো দেখতে আসবে সেই রাস্তার কোন একটা গাছে দড়ি দিয়ে বেঁধে ঝুলিয়ে দেয়া হবে।’

সন্ধ্যেবেলা কিংবা রাতের বেলা যে ব্যক্তি ওই পথ ধরে এই গ্রামে আসার সময় ওই হাড়িটা দেখতে পেলে সে যে কতটা ভয় পাবে সেটা উপলব্ধি করে দলের সবাই এই প্রস্তাবে রাজি হলো।


দলের একজন কি যেন বলতে যাচ্ছিল এমন সময় দূর থেকে ফটিকের গলা শোনা গেল। ফটিক এই দলেরই একজন। যার ভালো নাম গণেশ দাস। পাড়ার সবাই ওকে ফটিক নামেই ডাকে। ফটিক দলের কাছে এসে হাঁপাতে লাগলো। দলের সবাই তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো। তখন ফটিক সবার অস্বস্তিভাব কাটানোর জন্য হাঁপাতে হাঁপাতে বলল ‘ঘোষবাড়ির নৃতেন্দ্র জেঠু আমাদের বন্ধু কালু কিনে নিয়ে যাচ্ছে, আজ পাঁঠা বলি দেবে বলে। তখন দলের একজন ছেলে বলে ‘বলিস কি রে? ওটা তো তোদের ছাগল তুই বিক্রি করলি কেন?’

ফটিক কিছু বলতে যাবে তার আগে দলের একটা ছেলে যাকে সবাই পচা বলে ডাকে সে এগিয়ে এসে বলল ‘ ওরা কারো কথা শোনে না। ওদের যেটা ইচ্ছা হবে সেটাই করবে। ওদের প্রচুর ক্ষমতা।’

তখন দলের ওই ছেলেটি বলল ‘ যার যত ক্ষমতাই হোক না কেন কেউ যদি নিজের ছাগল বিক্রি করবে না বলে তাহলে তারা কেমন করে কিনবে।’

এই কথার উত্তুরে রমণ বলে উঠলো ‘তুই তো এই গাঁয়ে থাকিস না, তাই তুই কিছুই জানিস না। তুই তো এই পূজোতে মামারবাড়ি বেড়াতে এসেছিস আবার চলে যাবি।’

রমণ একটু থেমে গিয়ে বলল ‘দাঁড়া, তোকে আর বছর কার একটা ঘটনা বলি।’

তারপর রমণ একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল ‘আমার মা আমার মামার বাড়ি থেকে একবার একটা ছাগল কিনে এনেছিল। ছাগলটার জন্য আমার বাবা কিংবা আমার মা ঘাস কেটে এনে খাওয়াত, অথবা, মিতেন্দ্র জেঠুর গোরুদের চড়াতে নিয়ে যাওয়ার সময় মাঠে নিয়ে যেত। ওই ছাগলটা আমার মায়ের খুব প্রিয় ছাগল ছিল। কতটা প্রিয় তার একটা নমুনা দিলে বুঝতে পারবি, আমার ঠাকুমা যখন মারা যায় তখন তার শ্রাদ্ধ, শান্তি ইত্যদির জন্য প্রচুর টাকা খরচা হয়ে যায়। এমনকি  মিতেন্দ্র জেঠুর কাছে  ধার পর্যন্ত করতে হয়। সে বছর আমাদের প্রচুর অর্থাভাব দেখা দেয়। এমনকি এমন টাকা ছিল না যেই টাকা দিয়ে ধানের বীজ কিনে চাষ করবে। তখন আমার বাবা আমার মায়ের সামনে গড্ডুকে বিক্রি করার প্রস্তাব রাখতেই মা সেই প্রস্তাবে নাকচ করে দেয়। বাবা মাকে বলে যে গড্ডুকে বিক্রি করা ছাড়া আমি আর কোনো উপায় দেখতে পাচ্ছি না।  যদি গড্ডুকে বিক্রি না করা হয় তো বীজ কেনা হবে না। বীজ না কিনলে চাষ করা হবে না। আর যদি চাষ না করি তাহলে সারাবছর কি খাব? তাছাড়া মহাজনের ধার শোধ করব কি করে।

মা এই কথা শুনে নিজের কান থেকে একটা সোনার কানের খুলে বাবার হাতে দিয়ে বলে এইটাকে বন্দক দিলে তুমি কিছু টাকা পাবে...

তখন বাবা বলল আমি এ কাজ করতে পারবো না। এমনিতেও শ্বশুরবাড়ি থেকে দেওয়া তোমার সমস্ত গহনা আমি ব্যাংকে বন্দক দিয়েছি। তা অনেক কাল হওয়ার পরও ছাড়াতে পারলাম না। এই কানের দুটোই শেষ সম্বল ছিল। সেটাও দিয়ে দেব!

তখন মা বাবাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে তাতে কি হয়েছে, তুমি তো একটা কানের দিচ্ছ আর একটা কানের তো আছে! তাছাড়া তুমি এখন এই কানেরটা দিয়ে বিজ কিনে এনে চাষ করো। এবছর না হোক আর বছর আমার এই একটা কানের ছাড়িয়ে আনবে।

আমার বাবার কিছু বলতে পারেনা। ‌ এবং আমার মায়ের সোনা নিতে বাধ্য হয়।’

এরপর রমন রাগে দাঁতে দাঁত ঘষে এবং মৃদু সুরে বলতে লাগলো–

‘ একদিন আমার বাবা ওই ছাগলটিকে মাঠে নিয়ে যায় । ছাগলটাকে পদ্মপুকুরের পাড়ে বেঁধে দিয়ে আমার বাবা জমিতে কাজ করছিল। আর ওই ছাগলটা পুকুর পাড়ের কচি কচি ঘাস খাচ্ছিল। তখন সেখানে মিতেন্দ্র জেঠুর ছেলে চার পাঁচটা ছেলের সাথে এসেছে পদ্ম ফুল দেখবে বলে! তারা সবাই ছুটে যাচ্ছিল পদ্মফুল তুলবে বলে তখন মিতেন্দ্র জেঠুর ছেলে আমাদের ছাগলের দড়িতে পা জড়িয়ে পড়ে যায়।’

রমণ একটু মৃদু কিন্তু গম্ভীর সুরে বলল ‘ তখন মিতেন্দ্র জেঠুর ছেলে পাশে পড়ে থাকা একটা পাথর নিয়ে আমাদের ছাগলের মাথায় এমন ভাবে মারে যে ছাগলটা তখনই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে...।’

এরপর রমণ আর কিছু বলতে পারল না। সে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। তাকে কাঁদতে দেখে দলের সবার মন খারাপ হয়ে গেল। নিত্যানন্দ এগিয়ে গিয়ে তার চোখের জল মুছে দিল।

এরপর দলের একজন বলে উঠল ‘এই কথা মিতেন্দ্র জেঠুকে বলিস নি?’

এইকথা মিতেন্দ্র জেঠুকে আমার বাবা

তখন রমন চোখ মুছতে মুছতে বলল ‘নালিশ করেছিল বলেই তো আমার বাবাকে অপমান করে। কাজ থেকে ছাড়িয়ে দিল।'

দলের সেই ছেলেটি বলল ‘তোর বাবাকে কি বলেছিল’

তখন রমন বলল ‘সেটা বাবা আমাকে বলেনি। শুধু এইটুকুনি জানি যে বাবাকে  মিতেন্দ্র জেঠু অপমান করেছিল। এবং সুদের টাকা বাড়িয়ে দেয়। কারণ তার কাছ থেকে ধার করেছিল।’

দলের সেই ছেলেটি আবার বলে উঠলো ‘পুলিশের কাছে নালিশ করনি।’

তখন ফটিক বলে উঠলো ‘কেউ ওদের বিরুদ্ধে নালিশ নেবে না। ওদের প্রচুর ক্ষমতা। ওদের বাড়ির লোকেদের সাথে বড় বড় নেতা মন্ত্রী পুলিশের ওঠা বসা।’

তখন ওই ছেলেটি বলল ‘তুমি কি করে জানলে ফটিক দাদা’

তখন ফটিক বলল ‘ এই তো কিছুক্ষণ আগে ছাগলটাকে যখন বিক্রি করে দিল। তখন আমি খুব কান্নাকাটি করছিলাম বলে। আমার মা আমার বাবাকে ছাগল বিক্রির কথা জিজ্ঞাসা করতে বাবা এটা বলল মাকে। আমি আড়াল থেকে শুনেছি’

নিত্যানন্দ বলে উঠলো ‘এটা যাহোক করে বন্ধ করতে হবে। যারা অন্যায় করে এবং যারা অন্যায় মুখ বুজে সহ্য করে তারা সমান দায়ী...।’

নিত্যানন্দ কি যেন একটা বলতে যাচ্ছিল তখন তাকে বাধা দিয়ে পচা ব্যঙ্গ করে তার কথা পুনরাবৃত্তি করলো এবং বলল ‘ তুই কি করবি? বড়রা পারেনা আর তুই পেরে যাবি। বাংলা একটা কথা আছে জানিস তো–

হাতি ঘোড়া গেলো তল

       মশা বলে কত জল।

সেই হয়েছে তোর, বুঝলি ফুল নিত্যানন্দ।তুই যা করবি কর ভাই আমরা নেই। তোর জন্য ভাই আমরা সবাই গ্রাম ছাড়া হতে পারব না।’

নিত্যানন্দ তার কথার কিছু উত্তর না দিয়ে দ্বিতীয় চিন্তায় নিমজ্জিত হলো। খানিকক্ষণ পর দলের একটা ছেলেকে ডেকে কি জানো আলোচনা করতে লাগলো।’

তারপর সবাইকে বাড়ি যেতে বলে সে  বট গাছের তলায় বসে হাতে একটা লাঠি নিয়ে ভূমিতে আঘাত করতে লাগলো এবং কি যেন আকাশ কুসুম ভাবতে লাগলো। এমন সময় একজন জিন্স প্যান্ট এবং সাদা জামা কাঁধে একটা ব্যাগ নিয়ে নিত্যানন্দের সামনে এসে জিজ্ঞেস করলো ‘বলছি বাবু রায়পাড়া টা কোন দিকে বলতে পারবে।’

তখন নিত্যানন্দ চিন্তামগ্ন অবস্থায় তার ডান হাত তুলে একদিকে ইশারা করে বলল ‘ওই দিকে’

কিন্তু কোন দিকে যে নির্দেশ সেটা করলো সেটা কারোর বুঝার উপায় নেই।

লোকটি আবার জিজ্ঞাসা করল কোন দিকে। তখন নিত্যানন্দ একই ভঙ্গিতে একই জবাব দিল। লোকটি যখন বুঝতে না পেরে কথা পুনরাবৃত্তি করতেই নিত্যানন্দ বললো ‘আমি জানি না।’

তখন লোকটি অন্য কারো সাহায্য নিয়ে রায়পাড়া সন্ধানে চলে গেলেন।


দুপুরবেলা চান টান করে নিত্যানন্দ খেতে  বসেছে এমন সময় কালো প্যান্ট এবং সাদা জামা পরা ভদ্রলোক টা ঢুকে বলে

‘কেমন আছিস তোরা’

নিত্যানন্দ মা পেছন ফিরে দেখে এবং বিস্ময়ে আনন্দে অভিভূত হয়ে বলেন ‘ ও মা দাদা তুমি! কতদিন পর’ এই বলে নিত্যানন্দর মা ওই ভদ্রলোকটিকে প্রণাম করিল।

নিত্যানন্দের মামা এক কাজে বহুদিন দেশের বাইরে ছিল। ইতিমধ্যে নিত্যানন্দের মায়ের স্বামীর মৃত্যু হয়েছে এবং নিত্যানন্দও অনেক বড়ো হয়েছে। কিন্তু একবারও দাদার সাথে সাক্ষাৎ হয়নি। আজ বহুকাল পড়ে দেশে ফিরে এসে নিমাই বাবু তার বোনকে দেখতে এসেছে। নিত্যানন্দের মামা বাইরে দেশের  যাওয়ার আগে যখন এসেছিলেন নিত্যানন্দ তখন খুবই ছোট।

নিত্যানন্দের মামা একটা মিষ্টির প্যাকেট বের করে নিত্যানন্দের মায়ের হাতে দেই।

নিত্যানন্দর মা মিষ্টির প্যাকেট হাতে নিয়ে বলে ‘এসবের কি দরকার ছিল দাদা!’

নিমাইবাবু বলেন ‘বা রে কতদিন পর বোনের বাড়ি আসছি। সামান্য মিষ্টি টুকু না আনলে হয়। আর এই নে এই ব্যাগ টা ধর আমার ভাগ্নের জন্য  বেশ কিছু খাবার এনেছি।’

এই কথা বলে হাতের ব্যাগটা নিত্যানন্দের  বাড়ির বারান্দায় রেখে দিল। এরপর তিনি নিজের কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ থেকে একটা বই বের করলো। বই টা নিত্যানন্দের মায়ের হাতে দিয়ে বলে ‘ এই নে বিখ্যাত শিশু সাহিত্যিক সুকুমার রায়ের এই গ্ৰন্থটি ভাগ্নেকে পড়তে বলবি। ওর ভালো লাগবে’

এই সমস্ত কথা নিত্যানন্দ খেতে খেতে শুনছিল তাই সে যাহোক করে খেয়ে হাত ধুয়ে বাইরে চলে আসে। সে ওই লোকটাকে দেখেই প্রাথমিক ভাবে ভয় খেয়ে যায় কারণ এই লোকটাকে সে রায় পাড়ার সন্ধান দেয়নি।এই কথাটি যদি নিমাই বাবু তার মাকে বলে দেয় তাহলে তার মা যে মারবে এটা সে বুঝতে পেরেছিল।

কিন্তু তার মামা পূর্বের কোন কথায় না বলে তাকে বলে ‘কেমন আছো?'

নিত্যানন্দ ভয়ে ভয়ে বলল 'ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?'

নিমাই বাবু জবাব দিলেন ‘ভালো আছি’।

নিত্যানন্দের মা নিত্যানন্দকে এক বকা দিয়ে বলে, ‘বড়দের যে প্রণাম করতে হয় সেটা কি তোমাকে শেখাতে হবে?'

নিত্যানন্দ এগিয়ে আসছে দেখে নিমাই বাবু বলে ওঠে 'থাক! থাক! আর প্রণাম করতে হবে না। আমার আশীর্বাদ সবসময় তোমার সঙ্গে থাকবে'


সন্ধ্যেবেলা নিত্যানন্দ ঘোষ বাড়িতে কালি মন্দিরের সামনে গিয়ে কালীর ঠাকুরের দিকে জোড় হাত করে একবার প্রণাম করলো তারপর হাত জোড়  অবস্থায় বুকের কাছে রেখে কালী ঠাকুরের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কি যেন বলতে লাগলো! তাকে দেখে মনে হল আগেকার দিনের চাষীরা যেমন ভাবে  জমিদার কিংবা মহাজনের সামনে গিয়ে বিভিন্ন দৃষ্টান্ত তুলে ধরে ক্ষমা চাইত, ঠিক সেই ভাবে নিত্যানন্দও জানাচ্ছে।

বেশ কিছুক্ষণ পর সে কালী ঠাকুরকে প্রণাম করে মন্দির থেকে প্রস্থান করল।


                         ৩

রাত দশটার সময় নিত্যানন্দ আবার সেই মন্দিরে সামনে গেল। এবার আর কাছে না গিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে রইলো। রাত এগারোটার সময় পাঁঠা বলি করার কথা মাইকে ঘোষণা করা হলো। পাঠা বলি জায়গাটা ঘিরে দাঁড়িয়ে পরল সারি সারি মানুষ। তারা সবাই পাঁঠা বলি দেখবে। চারজন মানুষ চারটে পাঁঠা ছাগল চান করিয়ে পুরোহিতের সামনে নিয়ে গেল। তারপর বালিকাঠের কাছে নিয়ে গেল। প্রথম ছাগলটাকে বালিকাঠের ভেতর ঢুকিয়ে দেওয়া হলো। সে শেষবারের মতো একবার চেঁচিয়ে উঠলো তারপর তার শব্দ এক কোপে চিরকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেল। শরীর থেকে মস্তক আলাদা হয়ে গেল। শরীরটা ছটফট করতে করতে কার কাছে যেন নালিশ জানিয়ে তার সাড়া না পেয়ে হাল ছেড়ে দিল। এরাম করে আরো তিনটে ছাগল বলি দেওয়ার পর দেখা গেল নিত্যানন্দ ভিজে গায়ে মা কালীর মন্দিরের সামনে এসে ছাগলে রক্ত গায়ে মুখে মেখে ওই বগি তুলে বলে আরো ছাগল নিয়ে আয়। পাস থেকে একজন ভয়ে ভয়ে বলে ওঠে আর তো ছাগল নেই। প্রতিবছর চারটে ছাগল বলি হই বলেই এ বছরও চারটে ছাগল নিয়ে আসা হয়েছে। তখন নিত্যানন্দ বলল ‘এখানে ছাগল নেই তো কি হয়েছে মানুষ তো আছে। এতদিন তো ছাগল বলি হয়েছে, একটা নরবলি

হলে কি ক্ষতি হবে?’

এই কথা শুনি পাঁঠা বলি দেখতে আসা মানুষেরা যে দিকে পারে ছোট ছুটি করতে লেগে যায়। নিত্যানন্দ এগিয়ে গিয়ে মিতেন্দ্র হাত ধরে বলে ‘চো তোকে দিয়ে শুরু করি।’

মিতেন্দ বলে আমাকে ছেড়ে দাও তখন নিত্যানন্দ বলে উঠে, কেন রে!

আমি তোকে যদি আজ ছেড়ে দি তাহলে কিন্তু কোনোদিন আর বলি হবে না। চিরজীবনের মতো বন্ধ হয়ে যাবে। তখন মিতেন্দ্র বলে ঠিক আছে তাই হবে। আর কোনদিন বলি হবে না এই লাস্ট। জিতেন্দ্র পাশ থেকে বলে ওঠে হ্যাঁ হ্যাঁ আর কোনদিন বলি হবে না।

তারপর নিত্যানন্দের হাত থেকে অস্ত্র টা পড়ে যায় ‌ কিছুক্ষণ পর নিত্যানন্দ ও মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।  সেই থেকে ঘোষ বাড়িতে বলি বন্ধ হয়ে যায়।


পাড়ার কিছু ছেলেরা নিত্যানন্দ কে চ্যাংদোলা করে ধরে বাড়িতে পৌঁছে দেয়। বাড়িতে পৌঁছানোর পর সবাই তাকে জল দিয়ে জ্ঞান ফেরায়। পাড়ার এক বুড়ি তার মাথায় পাখা নিয়ে হাওয়া করতে থাকে। কিছুক্ষণ পর সবাই নিজের নিজের বাড়ি চলে যায়। নিত্যানন্দের মা কিন্তু নিত্যানন্দের চোখ দেখে তখনই বুঝে গিয়েছিল এটা সবকিছুই অভিনয়।

সেই রাতে নিত্যানন্দের মা কিছু না বললেও তারপরের দিন সকালবেলা নিত্যানন্দের মা নিত্যানন্দকে ডেকে বলে, ‘ সত্যি করে বল, তুই এটা বদমাইসি করে করেছিস। কোনো ঠাকুর তোকে ভর করেনি।’

নিত্যানন্দ কিছু বলছে না দেখে নিত্যানন্দের মা আবার বলে ওঠে, ’তুই বলবি না তাইতো? তুই যদি সত্যি কথা না  বলিস তাহলে তুই আমার মরা মুখ দেখবি’

তার মাকে আর কিছু বলতে না দিয়ে নিজে মার খাবে জেনেও নিত্যানন্দ তার মাকে জড়িয়ে ধরে সমস্ত কথা স্বীকার করে।

তার এই স্বীকারোক্তি শুনে নিত্যানন্দের মা নিত্যানন্দকে একটা লাঠি নিয়ে প্রহার করতে থাকে। এবং তাকে বকাঝকা করতে লাগে। পাশের ঘর থেকে তার মামা ছুটে আসে এবং সমস্ত কথা শুনেন। ভাগনাকে কারণ জিজ্ঞাসা করে নিত্যানন্দের মামা।তার ভাগ্নার মুখে সবকিছু শুনে জোরে হেসে ওঠে। এবং তার বোনের দিকে ইশারা করে বলে বুঝলি বোন এই ছেলেকে যদি ঠিক পরিমাণ সূর্য জল সার দেওয়া যায় তাহলে দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে এই ছেলে। একে আমি আমার সঙ্গে শহরে নিয়ে যাব যেখানে আমি থাকি। একে ভালো স্কুলে ভর্তি করাবো। একে বড়ো কোনো অফিসার বানাবো। এই গ্রাম এবং তার মাকে ছেড়ে যাওয়ার ইচ্ছা নিত্যানন্দের ছিল না কিন্তু সে যখন শুনলো যে তার মামা তাকে শহরে নিয়ে গিয়ে ভালো করে পড়াশুনা এবং প্রশিক্ষণ দিয়ে পুলিশ বানাবে। তাদের গ্রামের এই সমস্ত অন্যায় অবিচার বন্ধ করার জন্য সে রাজি হয়ে যায়। এবং সেই দিন থেকে মামাকে বিরক্ত করতে থাকে কবে সে কলকাতা যাবে। নিত্যানন্দের মায়ের নিত্যানন্দকে ছাড়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু নিত্যানন্দ কালীপুজোর দিন যা করেছে সেটা যদি একবার ঘোষ বাড়ির লোকেরা বিন্দুমাত্র আন্দাজ করতে পারে তাহলে তার ছেলেকে আর জ্যান্ত রাখবে না। এই কথা ভেবে নিত্যানন্দের মা নিত্যানন্দ কে ছাড়তে রাজি হয়েছিল। সত্যিই কখনো চাপা থাকে না।


এতদিন কবে যাবে কখন যাবে করিয়া নিত্যানন্দ তার মামাকে অস্থির করে তুলছিল। উৎসাহে তার রাতে নিদ্রা ঠিক করে হয় না। নিত্যানন্দের স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। নিত্যানন্দ আজ যাবে সেই শহরে যেখানে মামা থাকে। তাই সকাল সকাল উঠে ঠাকুরের জন্য ফুল তুলে ধুপ মোমবাতি জ্বেলে প্রণাম করে তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়ে মামার সঙ্গে মামার শহরে যাবে বলে।


শহরের মামার বাড়িতে যাওয়ার সময় নিত্যানন্দ দেখে চারিদিকে গাদা গাদা বাড়ি। কোথা থেকেও এক টুকরো আকাশ দেখা যাচ্ছে না। যা দেখা যাচ্ছে তা শুধু হরেক রকম কালারের যানবাহন, বিভিন্ন রকম মানুষের মুখ। যারা গোমরা মুখে আপন ছন্দে মাথা হেট করে হেঁটে যাচ্ছে। যাওয়ার সময় তার চোখ পড়ে রাস্তার ধারে বেশ কিছু ট্যাপ কলের উপর। কোন কোন ট্যাপ কলের মাধ্যমে মানুষ জল পড়ছে আবার কোন কোন ট্যাপ কলের মাধ্যমে মানুষ চান করছে। পুকুরের সাঁতার কেটে বেড়ানো ছেলেটার সুরু সুতোর মতো জলে মানুষকে চান করতে দেখে তার হাসি পেয়েছিল। মামার বাড়িতে পৌঁছে প্রথমত মামির সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। মামি মনে মনে খুব একটা সন্তুষ্ট হয়নি সেটা তার মুখ ভঙ্গি দেখেই বোঝা যায়। নিমাই বাবু স্ত্রী ‘নিমাই বাবুর এত বয়স হল কিন্তু এখনো কান্ডজ্ঞান হলো না’ এই কথা বলতে বলতে চলে গেল। এই কথা নিত্যানন্দ যখন শুনতে পাই তখন তার খুব একটা যে ভালো লেগেছিল সেটা বলা অন্যায় হবে। মূল্যত এই বয়সেই সেও ভালোবাসার জন্য কিঞ্চিত অতিরিক্ত কাতরতা মনে জন্মায়। এই বয়সে কোন সহোদয় ব্যক্তির কাছ থেকে ভালোবাসা পায় কিংবা সকল লাভ করে তাহলে তার জন্য সে অব্যয়কে শব্দরূপ দেবার চেষ্টা করে।


পরের দিন মামার সঙ্গে যায় শহরের নামকরা একটা সরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে। এই বিদ্যালয়েই তার মামার দুই কন্যা পড়াশোনা করে। এই ইস্কুলের হেডমাস্টারের ছিল নিমাইবাবুর বাল্যবন্ধু। তাই বহুদিন পর নিমাই বাবুকে স্কুলে আসতে দেখে ওই ইস্কুলের হেডমাস্টার নিমাই বাবুকে চা না খাইয়ে ছাড়লেন না।


কিছুদিন পর নিত্যানন্দ প্রথম শহরের স্কুলে পড়তে যাবে তাই সে আনন্দে আত্মহারা। স্কুল যাওয়ার দু'ঘণ্টা আগে তার মামি তার কাছে এসে হাতে একটা টিফিন বাস্ক দিয়ে বলে ‘ এই নাও, এটা খেয়ে আমাকে উদ্ধার করবে।’ এই কথা বলে মামি চলে যায়। তারপর নিত্যানন্দ ব্যাগ নিয়ে দুই বোনের সাথে স্কুলে যায়। তাকে দেখে দলের সবাই বুঝে যায় এই ছেলেটা খুবই সরল সাদাসিদে। এতটাই সরল সাদা সিদে যে আজকাল আর বাজারে চলে না। অনেক ছেলে টাকে খেপা, পাগল বলে ডাকতে থাকে। অনেক সময় অনেক ছেলে নিজের পালোয়ানগিরি দেখানোর জন্য তার সঙ্গে মারপিট করতে যেত। এই বয়সের ছাএদের স্কুলে স্যারের অনুপস্থিতকালে  যতরকম বদমাইশি বুদ্ধি, নিজের পালয়োন গিরি উপস্থাপন করতো। মাঝে মাঝে দলের কোন ছেলে জানিয়ে দেয় স্যারেদেরকে তখন ছেলেরা সবাই মার খায়। কিন্তু এই নিত্যানন্দ কারোর সঙ্গে মারপিট করতো না। এইজন্য ওই ক্লাসের অনেক ছেলেদের হাতে তাকে মারও খেতে হয়েছে।


এক বছর পর যখন রেজাল্ট আউট হলো তখন সবাই হতবাক হয়ে গেল এই ক্লাসের সব থেকে পাগল ক্ষ্যাপা যাকে বলা হয় সে প্রথম স্থান অধিকার করেছে। এই ক্লাসে প্রতিবছর প্রথম স্থানাধিকারী অপরিজিতা এবারের দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছে। যেমন তার নাম তেমন তাকে দেখতে। সুন্দর, ছিপছিপে গরন, রাশি রাশি কালো চুল। সব মিলিয়ে এক অপরূপ সুন্দর। তাকে দেখে স্বর্গের অপ্সরা ভাবলেও খুব একটা অন্যায় করা হবে না। কিন্তু কি জানতো এত সুন্দর একটা মেয়ের মনের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে আগুন। যেই আগুন আগ্নেয়গিরি লুকিয়ে রাখে। দূর থেকে দেখলে যাকে বোঝার উপক্রম নেই যে এই শান্ত সৃষ্ট পাহাড়টার মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে জ্বলন্ত ফুটন্ত ম্যাগমা, যা নিমেষে সব কিছু পুড়িয়ে ছাই করে দিতে পারে, কত মানুষের স্বপ্ন নষ্ট করে দিতে পারে। সেই আগুন লুকানো ছিল এই অপরিজিতার মনে সেটা কে জানত।


এই সরল সাদা সিদে নিত্যানন্দ সবার সঙ্গে মিশত। সবার সঙ্গে খোলা মনে কথা বলতো। কোনদিন দুঃখে তাকে থাকতে দেখা যায়নি। যত দুঃখের ব্যাপারই হোক না কেন? ঠিক দুঃখ চেপে হেসে ফেলেছে। ওর বিপদে কেউ আসুক আর না আসুক ও কিন্তু সবার বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়তো। এইজন্য ক্লাসের অনেক ছেলের কাছে তার গুরুত্ব কমে যায়। অনেকে তাকে পাগল ভাবতে থাকে। কিন্তু কে জানতো তার এই আচরণ তার মৃত্যুর কারণ হবে। নিত্যানন্দ সবার সঙ্গেই হাসিখুশিতে থাকতো। তার বন্ধুদের সঙ্গে মজা করত। কখনো বন্ধুদের রাগিয়ে কখনো আবার ঠাট্টা তামাশার মাধ্যমে মজা করত। তো এই অপরাজিতা এবং নিত্যানন্দ দুজন বন্ধু হয়ে যায়। কদিন দেখা যায় তাদেরকে একসঙ্গে বেরোতে ঢুকতে। কখনো দেখা যায় নিত্যানন্দ অপরাজিতা কে রাগছে কখনো আবার অপরিচিতা নিত্যানন্দকে রাগাচ্ছে। অনেকে তাদের প্রেমিক প্রেমিকা মনে করলেও আমরা কিন্তু মনে করতাম না। কারণ আমরা জানতাম যে নিত্যানন্দ আর যাই করুক, বন্ধুদের সাথে প্রেম করবে না। তার মতে বন্ধুত্ব আলাদা জিনিস, স্বামী-স্ত্রী আলাদা জিনিস। যে সম্পর্ক বন্ধুত্ব ভাবে গড়ে উঠেছে তাকে স্বামী স্ত্রী পর্যায়ে সে নাকি নিয়ে যেতে পারবে না। যাকে চিরকাল বান্ধবী হিসেবে মেনে এসেছে তার সামনে ‌ স্বামী হয়ে দাঁড়াতে সে নাকি পারবে না। এবং নিত্যানন্দকে যখন আমরা বিবাহের কথা তুলতাম তখনই সে মজা করে বলতো আমি দুই পক্ষের বাড়ির সম্মতি নিয়ে বিয়ে করবো। 


তো অপরাজিতার সঙ্গে ভালই খুনসুটি হত সরল সাদাসিধে নিত্যানন্দের সঙ্গে। আমাদের স্কুলের পরীক্ষার কদিন আগে অপরিজিতা স্কুলে এসে হেড স্যারের কাছে নিত্যানন্দের নামে নালিশ করে অপরিজিতা বলে ‘স্যার নিত্যানন্দ প্রতিদিন আমার গায়ে পড়ে, আমাকে বিরক্ত করে,আমার সাথে অসভ্যতামি করে, একদিন আমার হাত ধরে টেনে ছিল সেটা আমাদের পাড়ার একটা ছেলের দোকানের সিসিটিভি ফুটেজে উঠেছে।’

অপরিজিতা কি বলতে যাচ্ছিল তারপর কিন্তু বলতে পারেনা। ফুপিয়ে, ফুপিয়ে, কেঁদে ফেলে। দরদের চেয়ে ছোঁয়াচে কিছুই নেই এ বিশ্বে তাই  স্যারের মন খারাপ হয়ে গেল। স্যার ওকে সান্তনা দিয়ে কান্না বন্ধ করতে বলে ‌এবং এক গ্লাস জল খাওয়ার উদ্দেশ্যে তার দিকে বাড়িয়ে দেয়। জল না খেয়ে চোখের জল দুহাতে করে মুছে সে আরো বলতে থাকে

‘আমি এই কথাগুলো আমার বাবাকেও বলতে পারিনি। আমার বাবা যদি এসব শুনে তাহলে আমার পড়াশোনা ছাড়িয়ে দেবে এবং বিয়েও দিয়ে দিতে পারে। আমাদের বাড়িতে এগুলো পছন্দ করেনা। ওই ভিডিওটা যদি আমার বাবার চোখে পড়ে যায় বা আমার যখন হাত ধরেছিল তখন যদি আমাদের বাড়ির কেউ দেখে ফেলতো তাহলে...’

এরপর অপরিজিতা আবার কেঁদে ফেলে এবং একটা পেনড্রাইভ বাড়িয়ে দেয়। পেনড্রাইভের ভিডিওতে দেখা যায় ব্যস্ত রাস্তায় নিত্যানন্দ অপরাজিতার হাত ধরেছিল। প্রথমে আমরা নিজের কানকে বিশ্বাস করছিলাম না কিন্তু নিজের চোখে যখন ভিডিওটা দেখলাম তখন নিজের ‌চোখকেও বিশ্বাস করতে পারি না। নিত্যানন্দের মতো একটা ছেলে অপরিজিতার সাথে অসভ্যতামি করে, তার হাত ধরে, তার গায়ে পড়ে, তার গায়ে হাত তোলে।


মেয়েদের সাথে যে এরকম অভদ্র আচরণ করে তাকে আমাদের হেডস্যার সহ্য করতে পারে না। তাই ওকে ডেকে প্রচুর মারেন, এবং অপমান করেন। সেদিনকে ওর কোনো কথা হেডস্যার শোনেন নি। সেদিনকে ওর সমস্ত কথা আমাদের অজুহাত মনে হয়েছিল। হেডস্যার নিত্যানন্দকে বলে ‘পড়াশোনায় ভালো হলেই সে ভালো মানুষ হবে এমনটা নয়। মানুষ হয়ে পশুর মতো আচরণ করো না। আমি এটা তোমার মামাকে জানালাম না।এটা যদি তোমার মামাকে জানায় তাহলে তোমার মামা প্রচুর কষ্ট পাবে। তোমার মামা কত ভদ্র ছিল আর তুমি তার ভাগ্না হয়ে মেয়েদের সাথে খারাপ ব্যবহার করছো। তোমাকে আমি ভালো ভেবেছিলাম, তোমার আচরণ, পড়াশোনা, বুদ্ধি আমার খুব ভালো লাগতো কিন্তু এটা তোমার কাছ থেকে আশা করিনি। তুমি একজন ফাস্ট বয়। তুমি নাকি নারীদের কে সম্মান করবে, তা না করে এসব। ছ্যাঁ ছিঃ।’

হেডস্যার বাড়িতে না জানালেও খবরটা কিন্তু তার মামার কাছে চলে যায়। মামা তাকে মারতে গিয়েও মারতে পারেন না। তিনি বলেন ‘তুই তো এরকম ছিলিস না। এটা যদি তোর মা জানতে পারে তাহলে কি হবে বুঝতে পারছিস। তোকে আমার ভাগ্না বলতে লজ্জা করছে। পড়াশোনা ভালো করলেই সে খুব ভালো মানুষ– এরকমটা যেন মনে করো না। কারণ পড়াশুনা সবাই করে কিন্তু মানুষের মানুষ হয় কজন। আগে মানুষ হও তারপর পড়াশোনা।’ তিনি তার কোনো কথাই না শুনে অপমান করে যেতে লাগলেন। বেশ কিছুক্ষণ পর চলে যাওয়ার সময় দরজার সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে ঘুরে বললেন ‘তুই আমাকে বলেছিলিস যে তুই নাকি পুলিশ হবি। পুলিশ হয়ে নিজের গ্ৰামের সমস্ত অন্যায়,অবিচার বন্ধ করবি। ঘোষ বাড়ির লোকেদের অত্যাচার যাতে সহ্য করতে না হয় তার জন্য নাকি তুই উপযুক্ত ব্যবস্থা নিবি।’

এরপর নিমাইবাবু নিত্যানন্দের কাছে গিয়ে বলে ’যে ছেলের মেয়েদের সঙ্গে অসভ্যতামি করে সে কিভাবে পুলিশ হয়ে  এরাকম নীতিমূলক কাজ করবে। আগে নিজের মনের মধ্যে ভদ্রতা নিয়ে আয় তারপর...’

এরপর আর কিছু না ঘর থেকে বেরিয়ে চলে যান। এই ঘটনার পর থেকে আমরা কেউ ওর সঙ্গে মিশতাম না। ও গিয়ে লাস্ট বেঞ্চিতে একটা কোনায় গিয়ে বসতো। স্যারেরাও ওকে বেশি পাত্তা দিত না। অনেক মেয়েরা ওর থেকে দূরে থাকতে চাই তো। প্রাইভেটে ওর পাশে কেউ বসতে রাজি নয়। অনেকের বাড়ির লোক প্রাইভেটের মাস্টারকে বলে যে ওই ছেলেটা যদি পড়তে যায় তাহলে আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদেরকে পাঠাবো না। তাই প্রাইভেটের মাস্টার বাধ্য হয়ে তাকে ছাড়িয়ে দেয়।


একদিন এই নিত্যানন্দকে বাড়িতে পাঠানো নিয়ে নিমাই বাবু এবং তার স্ত্রী জোর ঝগড়া লাগেন। নিমাইবাবু স্ত্রী বলেন ’তুমি ওই চরিত্রহীন নিত্যানন্দকে বাড়ি পাঠিয়ে দাও।’

নিমাইবাবু বলেন ‘ছেড়ে দাও না! ও‌ হয়তো ভুল করে ফেলেছে। মানুষ মাত্রই ভুল হয়। ও আমাকে বলেছে ও এইসব কিছু করবে না।’

মামাকে আর কিছু বলতে না দিয়ে বলে ওঠে, ‘কিছু করবে না বললেই হলো। যদি করে তখন। যদি আমার মেয়েদের সাথে এরকম কিছু করে’

নিমাই বাবু বলে ‘কি উল্টাপাল্টা বকছো তুমি, এসব কথা বলো না।’

নিমাই বাবুর স্ত্রী ‘যেদিন ঘটবে সেদিন‌ বুঝবে। গরীবের কথা বাসি হলে ফলে। তুমি তো সবসময় বলো যে আমার ভাগ্না এসব করতেই পারে না। যেদিন নিজের ঘরের সাথে করবে সেদিন বুঝবে।

নিমাইবাবু বলেন ‘ আস্তে কথা বল পাশের ঘরে নিত্যানন্দ বসে আছে। শুনতে পাবে।’

নিমাই বাবুর স্ত্রী বলেন ‘যে শুনবে শুনুক। তুমি ওর মাকে ফোন করে ছেলের ক্রিয়াকলাপ বলো । বলো ছেলেকে নিয়ে যেতে।’

নিমাইবাবু কথা না বাড়িয়ে চলে যান।

নিমাই বাবু যতই চেষ্টা করুক যে এই সমস্ত ঘটনা নিত্যানন্দের মায়ের কাছ থেকে আড়াল করে রাখবে সেটা সম্ভব হয় না। নিমাই বাবুর স্ত্রী একদিন সুযোগ বুঝে নিত্যানন্দের মায়ের মোবাইল নাম্বার নিয়ে নিত্যানন্দের মাকে ফোন করে এই সমস্ত ঘটনা বলে। নিত্যানন্দের মা তার মামীর থেকে নিমাই বাবুর বর্তমান বাড়ির ঠিকানা জেনে সেখানে চলে আসেন এবং নিত্যানন্দকে খুব বকাঝকা করে এবং মারে। নিত্যানন্দ সেই রাতে একটা চিঠি লেখে। দেয়ালে চোখ দিয়ে লিখে যায় ‘ মা আমি দোষ করেনি। বাবা যখন বেঁচে ছিল তখন আমাকে শেখাতো সম্মান টাকার চেয়েও মূল্যবান। টাকা একবার চলে গেলে আবার ফিরে পাওয়া যায় পরিশ্রমের মাধ্যমে। কিন্তু সম্মান একবার চলে গেলে সেটা আর ফিরে পাওয়া যায় না। তাই আমি চললাম মা। আশীর্বাদ করো। দুঃখ পেও না’

তারপরের দিনটাকে কোথাও দেখা যায়। রাতের বেলা পুলিশ এসে জানাই যে নিত্যানন্দ জলে ডুবে আত্মহত্যা করেছি। এবং তার লাশ পাওয়া গেছে। চিঠি পড়ে পুলিশের লোক অপরাজিতার বাড়িতে হানা দেয়। এবং সেই দোকানে পুলিশের লোক খবর নিয়ে জানতে পারে যে দোকানের মালিক আগে থেকেই নিত্যানন্দের আত্মহত্যা কথা শুনি পালিয়ে গেছে। কিছুদিন পর তাকে একটা শহরের বস্তি থেকে ধরা হয়। সেই ভয়ে সব স্বীকার করে যে নিত্যানন্দর কোন দোষ ছিল না। পুলিশের চাপে অপরাজিতা বলতে থাকে সেদিন ঠিক হয়েছিল। অপরাজিতা বলে  ‘আমি ওকে রাস্তা পারাপার করে দেয়ার জন্য আমার হাতটা ধরতে বলেছিলাম। যাতে আমার পাড়ার দাদার সিসিটিভি ফুটেজে ভিডিওটা হয়েই যায়। আসলে নিত্যানন্দের কোন দোষ ছিল না।’

পুলিশ তার কারণ জিজ্ঞাসা করলে অপরাজিতা জানায় ‘ আমি প্রতিবছর ফার্স্ট হতাম। প্রাইভেটে স্কুলে সমস্ত জায়গার মাস্টারমশাই আমাকে ভালবাসতেন। কিন্তু ওই নিত্যানন্দ যবে থেকে এসেছে তবে থেকে আমার প্রশংসার অধিকাংশ সে কেড়ে নেয়। এমনকি সে আমাদের ক্লাসের প্রথম স্থান অধিকার করে, তাছাড়া আমাদের ক্লাসের সমস্ত বন্ধুরা, ওকে ভালোবাসতো। এবং ও খুব জনপ্রিয় হয়ে গিয়েছিল। ও আসার পর থেকে আমি বুঝতে পারি আমার চাহিদা আস্তে আস্তে কমছে। আমি এটা সহ্য করতে পারি না তাই আমি চেয়েছিলাম তাকে একটুখানি বন্ধুদের চোখে এবং স্যারেদের চোখে খারাপ করে দেয়ার জন্য এটা করেছি। আমি ভাবতে পারিনি যে এটা এরকম একটা ঘটনা হয়ে যাবে

।’

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ছড়া:- চললো খোকা

ছড়া:– বাগানের মালি কাঠবিড়ালি।

ছড়া:- খোকার মামার বাড়ি