শ্রদ্ধা জানাও, হৃদয়ে বসাও

       গল্প:-শ্রদ্ধা জানাও, হৃদয়ে বসাও।

          লেখক:- সোহন ঘোষ।


আনিস ছোটবেলা হইতেই স্বপ্ন দেখিত—সে বড় হইয়া একদিন খ্যাতনামা গল্পকার হইবে। কবিতা সে বহু লিখিয়াছে, শিক্ষক ও সম্পাদকদের প্রশংসাও লাভ করিয়াছে; কিন্তু গল্পের জগৎ তাহার নিকট ছিল এক রহস্যময়, অচেনা ভূমি।


একদিন সাহস সঞ্চয় করিয়া সে তাহার পিতার নিকট গিয়া কাতর কণ্ঠে বলিল,

— “বাবা, আমি গল্পকার হইতে চাই।”


পিতা মৃদু হাসিয়া বলিলেন,

— “সুন্দর কথা। কিন্তু বল তো, কী বিষয় লইয়া লিখিবি?”


আনিস কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া মাথা নত করিয়া বলিল,

— “সেই সিদ্ধান্ত এখনো লইতে পারি নাই। সম্পাদকমশায় বলিয়াছেন, এখন কেবল কবিতা লিখিলে চলিবে না—গল্পও লিখিতে হইবে। গল্পের নাকি চাহিদা এখন খুব বেশি।”


পিতা তখন গম্ভীর হইয়া বলিলেন,

— “কেবল বাজারের কথা চিন্তা করিয়া লেখা উচিত নয়। গল্প, কবিতা, নাটক—ইহা সব ভালোবেসে লিখিতে হয়। সাহিত্যকে যাঁহারা হৃদয় দিয়া অনুভব করেন, তাঁহারাই লিখিতে পারেন। গল্প লিখিতে হইলে চাই দৃষ্টিভঙ্গি, চাই অনুভবশক্তি। লেখকের দৃষ্টি ও সাধারণ মানুষের দৃষ্টি এক নহে। কলমকে যাঁহারা সত্যিকার অর্থে ধারণ করেন, তাঁহারাই পারেন সমাজের মুখপাত্র হইতে।”


আনিস মিনতি করিয়া বলিল,

— “বাবা, অন্তত প্রথমবার একটু সাহায্য করো। আমি জীবন লইয়া লিখিতে চাই—এমন এক গল্প, যাহাতে মানুষ শিক্ষা পাইবে, বোধ পাইবে।”


আনিসের পিতার কণ্ঠে তখন এক অদ্ভুত ধৈর্য; চোখে মৃদু এক দীপ্তি—যেন অভিজ্ঞতার আলো।


তিনি বলিলেন,

— “দেখ আনিস, গল্প মানেই কেবল কল্পনার খেলা নহে। গল্প একটি দায়িত্ব... একটি সাধনা।

তুই যখন বলিলি লিখিতে চাস, আমি তোকে পথ দেখাইতেছি, ভাবনার এক আলো দিতেছি।

দেশ আর দশের মঙ্গলের জন্য যদি আমার বলা কথাগুলি তোর কলমে নতুন প্রাণ পাইয়া উঠে, তবে সেটাই তো আমার সবচেয়ে বড় গর্ব।


তবে মনে রাখিস—

আমি বলিতেছি, কিন্তু লিখিবি তুই—নিজের অনুভব দিয়া, নিজের চোখে দেখা জগৎ দিয়া।

তোর কলমে থাকিবে তোর ভাষা, তোর প্রশ্ন, তোর চেতনা।

এইটিই হইবে তোর নিজের গল্প—আমার গল্পের ছায়ায় জন্ম লইয়া এক নতুন সত্য।”


পিতা তখন স্মৃতিমগ্ন হইয়া বলিলেন,

— “তবে শোন, আমি আমার জীবনের এক ঘটনা বলি, যাহা আজও আমার হৃদয়ে গেঁথে আছে।


“আমি তখন অতি কিশোর। মামার বিবাহ উপলক্ষে গিয়াছি তাহার বাড়ি। আমার পিতা ছিলেন একজন কৃষক, আর মাতা এক গৃহিণী।


আমার ধনী মামা বাংলা ভাষাকে ঘৃণা করিতেন। একদিন তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন,

— ‘তোমার প্রিয় বিষয় কী?’


আমি গর্বভরে বলিলাম,

— ‘বাংলা সাহিত্য।’


তিনি অবজ্ঞার ভঙ্গিতে মুখ বিকৃত করিয়া বলিলেন,

— ‘ওতে কিছুই নাই। বাংলা ভাষায় না আছে জ্ঞান, না আছে ভবিষ্যৎ। ওটাকে ভালোবাসিলে তোমাকেই এই বাংলাতেই থাকিতে হইবে। বিদেশে যাইতে পারিবে না। ওই মাঠেই খাটিতে হইবে, চাকরি পাইবি না। কেউ চিনিবে না তোকে।’


আমি স্তম্ভিত হইয়া গেলাম। অন্তর কাঁদিয়া উঠিল। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্র, সুকান্ত—তাঁহারা কি তবে কিছুই নন? বাংলা ভাষা কি সত্যিই নিঃস্ব?


আমি জানি—এই ভাষার প্রতিটি ছন্দ, প্রতিটি শব্দ হৃদয়ের গভীর হইতে উঠে আসে।


পরে একদিন মামা আমাকে লইয়া গেলেন এক বৃদ্ধ মুচির নিকট—জুতো পালিশ করাইবার জন্য। পা হইতে জুতো খোলার প্রয়োজন বোধ না করিয়া তিনি আদেশ করিলেন,

— ‘এই মুচি, জুতোটা পালিশ কর।’


আমি সংকুচিত হইয়া বলিলাম,

— ‘মামা, অন্তত জুতোখানি খুলিয়া দিন।’


তিনি বিরক্ত হইয়া বলিলেন,

— ‘পায়ে ধুলো লাগিবে।’


আমি তাহার আচরণে লজ্জিত হইলাম। এক মুহূর্তে মনে হইল—এই বৃদ্ধ মানুষটির প্রতি অবজ্ঞা দেখানো হইল কেবল তাহার পেশার জন্য! অথচ, তিনিই তো আমাদের পথকে প্রতিদিন নির্মল রাখেন।


আমি গাড়িতে বসিয়াই খাতা বাহির করিলাম এবং লিখিলাম—


> মুচি, বসিয়া রহো নীরব হৃদয়ে,

চাহো পায়ের দিকে, নত দৃষ্টি লইয়া।

তুমি করো পথ মসৃণ, করো গতি সহজ,

তবু সমাজ তোলে না শ্রদ্ধার নত শির।


হাসো তুমি—না বলা বেদনা লুকায়,

ক্লান্তি ভুলিয়া সেবায় নিজেকে বিলায়।

চুপ করিয়া করো কর্ম, না চাহো কিছুই,

সম্মান নয়, চাহো শুধু মানবতা বুঝি।


আমি জানি, বুঝি তোমার গোপন কষ্ট,

বুকের মাঝে জমে থাকা অবহেলার গ্রন্থি।

লোকে হাসে তোমার পেশায়, করে তাচ্ছিল্য,

অন্ধ হইয়া টাকার মোহে ভুলে যায় হৃদয়।


"যাহারা পারে না পরের পেশাকে সম্মান করিতে,

তাহারা কেমন করিয়া নিজ পেশা দিবে মর্যাদা?"

পেশা লঘু নহে, পেশা হইল আত্মার প্রকাশ,

পেশাতেই লুকায় চরিত্রের আসল পরিচয়।


তুমি জুতা পালিশ করিয়া দাও দীপ্ত পথ,

তবু সমাজে নাহি জাগে তব আশার আলো।

তোমার ঘামে গাঁথা যেই মানবসভ্যতা,

তাহার পৃষ্ঠে লিখিত তব অব্যক্ত বেদনার কথা।





সেই দিন হইতেই মামার প্রতি হৃদয়ে এক দূরত্ব জন্মিল। আর তাহার সহিত কথা বলি নাই।


আনিস মুগ্ধ হইয়া পিতার কথা শুনিল। সে উপলব্ধি করিল—

লেখক হইবার প্রথম শর্ত হইল ‘দেখা’, ‘অনুভব করা’ এবং ‘হৃদয়ের ভাষায় লেখা’।

বাংলা ভাষা কেবল একটি ভাষা নহে—ইহা আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের অহংকার।


পিতা বলিলেন,

— “সাহিত্য যাঁহারা ভালোবাসেন, তাঁহারা কখনো মরেন না। তাঁহারা বাঁচেন মানুষের হৃদয়ে, ভাষার প্রবাহে, ভাবনার ধারায়।”


আনিস ধীরে মাথা নোয়াইয়া বলিল,

— “বাবা, আমি বুঝিতে পারিলাম—সত্যিকার গল্প কখনো বানানো যায় না, তাহা হৃদয় হইতেই উঠে আসে।”


আনিস কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিল।

তারপর ধীরে বলিল,

— “আচ্ছা বাবা, তারপর মামার কোনও খোঁজখবর নাওনি?”


পিতা তাকাইয়া রইলেন দূরের দিকে; চোখে গাঢ় এক অভিমান।

— “না বাবা। যে বাংলা সাহিত্যকে সম্মান দেয় না, যে বাংলার শ্রমজীবী মানুষদের এবং তাহাদের পেশাকে সম্মান করে না—সে যতই রক্তের সম্পর্ক হউক না কেন, তাহাকে আমি ‘আপন’ বলিয়া মানি না।”


এক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা ঘরটিকে ভারাক্রান্ত করিয়া তুলিল।


তারপর তিনি ধীরে বলিলেন,

— “আমি একজন বাঙালি। বাংলার ঘরে আমার জন্ম, বাংলায় আমার পরিচয়।

এই বাংলাকে যে অপমান করে, সে যতই আপন হউক—তাহাকে আমি হৃদয়ে স্থান দিব না।

এই বাংলাকে আমি কভু ভুলিতে পারিব না।

আমি জানি—একদিন এই বাংলা, এই মাটিই, আমাকে অমর করিয়া রাখিবে।”


তারপর কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিলেন। অতীতের স্মৃতি যেন হৃদয়ে আলোড়ন তুলিল।

তিনি ধীরে, গম্ভীর কণ্ঠে বলিলেন—


— “এই বাংলাকে, এই বাংলার মাটিকে ভালোবেসে কবি জীবনানন্দ দাশ লিখিয়া গিয়াছেন—

‘আবার আসিব ফিরে ধানসিড়িটির তীরে—এই বাংলায়।’

আর মাইকেল মধুসূদন দত্ত, যিনি বিদেশে গিয়াও মাতৃভাষার মায়া ভুলিতে পারেন নাই, তিনি লিখিয়াছেন—

‘এ বঙ্গ, ভান্ডারে তব বিবিধ রতন—

তা সবে (অবোধ আমি!) অবহেলা করি।’


বাংলা কেবল ভাষা নহে—ইহা হৃদয়ের নাম।

যে ব্যক্তি বাংলা সাহিত্যর মাহাত্ম্য বুঝিতে পারে না, সে কখনোই বাংলা নামক আবেগটিকে অনুভব করিতে পারিবে না।”


— “যে বলে—বাংলা সাহিত্যে কোনও মহৎ গল্প নাই, কিংবা বলে—এই সাহিত্য পাঠে কিছুই অর্জিত হয় না,

সে হয়তো বাংলা সাহিত্য কোনোদিন পড়েই নাই, অথবা না-বুঝিয়া কেবল পাতার শব্দ শুনিয়াছে।

বাংলা সাহিত্য কেবল কাহিনি নহে—ইহা এক অনুভব, এক আত্মচেতনা।

ইহাকে হৃদয় দিয়া না পড়িলে তাহার রস আস্বাদন করাও অসম্ভব।

বাংলা সাহিত্যকে বুঝিতে

 পারা এক আশীর্বাদ, আর তাহা অস্বীকার করা—এক নিঃসঙ্গ দুর্ভাগ্য।”


‘‘বাংলা আমার ভাষা, বাংলা আমার প্রাণ। আমি গর্বিত যে আমি একজন বাঙালি।’’

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ছড়া:- চললো খোকা

ছড়া:– বাগানের মালি কাঠবিড়ালি।

ছড়া:- খোকার মামার বাড়ি