চেতনার চক্ষু
গল্প:- চেতনার চক্ষু।
লেখক:- সোহন ঘোষ।
নিশির ঘোষ — এক সাধারণ গ্রামের ছেলে, যার দিন কেটে যায় ফোনের পর্দায় আর টিভির স্ক্রিনে। কাটুন, ভূতের সিনেমা, ইউটিউব, ফেসবুক — এই যেন তার জীবনের মানে। পড়াশোনার পাতায় ধুলো জমে, আর ঘরভর্তি থাকে অলস সময়।
তার বাবা একজন গোয়ালা — রোদে পুড়ে, ঘাম ঝরিয়ে প্রতিদিন গরুর দুধ থেকে ছানা তৈরি করেন। কখনো শহরের মিষ্টির দোকানে পৌঁছে দেন, কখনো ঘুরে ঘুরে দুধ বিক্রি করেন। সংসারের একমাত্র রোজগেরে মানুষ তিনি — যিনি কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে শুধু সংসারই চালান না, ছেলের ভবিষ্যতের জন্যও গড়ে তোলেন স্বপ্নের ভিত।
একদিন দুপুরবেলা, কাজ সেরে ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরে নিশিরের বাবা দেখেন — ছেলে পড়ার বই পাশে ফেলে ফোনে ভূতের ভিডিও দেখছে। এমন কাণ্ড দেখে তাঁর চোখে যেন আগুন জ্বলে ওঠে। গলা উঁচিয়ে বলে ওঠেন,
— "তুই পড়াশোনা না করে ফোনে ভিডিও দেখছিস? পড়বি না? তাহলে মাঠে গিয়ে গরু চড়াবি! জানিস, কত কষ্ট হয় গরুর পেছনে ঘুরতে, ছানা দোকানে পৌঁছে দিতে, দুধ নিয়ে দৌড়াতে?"
নিশির এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এবার চোখে জল নিয়ে হঠাৎ ফেটে পড়ে —
— "কষ্ট? ওই তো সাইকেল নিয়ে ছানা নিয়ে যাওয়া! পড়াশোনা তার চেয়েও কঠিন! তুমি বুঝবে না কখনো।"
বাবা গম্ভীর কণ্ঠে বললেন
— "একদিন নিয়ে গিয়ে দেখ না তবে, তখনই বুঝবি কোনটা বেশি কষ্ট।"
নিশির রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ছুটে যায় নিজের ঘরে।
দুপুরে, প্রতিজ্ঞা করে কাজে নামে — "দেখিয়ে দেবো আমি!" ভারী দুটো ছানার বালতি কোনো রকমে সাইকেলের পেছনে বেঁধে রওনা দেয় শহরের দিকে। কয়েক মাইল যাওয়ার পরই হাঁপিয়ে পড়ে — বুক ধকধক করছে, হাঁটু কাঁপছে, গলা শুকিয়ে কাঠ। রাস্তায় থেমে বসে পড়ে। শরীর ক্লান্ত, তবু নিশির মনে জ্বলতে থাকে জেদের আগুন। মনের এক কোণে তখনও বাবার ওপর অভিমান জমে আছে। একটু বসে থাকার সুযোগ নেই, কারণ ঠিক সময়ে স্টেশনে না পৌঁছালে ট্রেন ধরতে পারবে না। তাই বেশিক্ষণ বসে না থেকে আবার উঠে পড়ে, সাইকেল চালিয়ে স্টেশনের দিকে রওনা দেয়।
স্টেশনে পৌঁছাতে পৌঁছাতে নিশির শরীরটা একেবারে বিক্ষত — ঘাম টুপটাপ ঝরছে, মুখে স্পষ্ট ক্লান্তির ছাপ। কলের কাছে গিয়ে জল খেতে যাবে, এমন সময় হঠাৎ ট্রেনের বাঁশি বেজে ওঠে। জল না খেয়েই দৌড়ে ট্রেনে উঠে পড়ে।
ট্রেন ছাড়ে, কিন্তু নিশির মনে তখন ছুটে বেড়ায় এক পুরোনো স্মৃতি, যা তার বিবেককে কুরে কুরে খাচ্ছিল। মনে পড়ে যায় ছোটবেলার সেই দিনগুলো — স্কুলে যাওয়ার পথে রাস্তার পাশের টাইমকল ভাঙা, বন্ধ কল খুলে রাখা, বাড়িতে অকারণে জল অপচয় করা — সব ছবি যেন একে একে চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
আজ, তৃষ্ণায় গলা যখন ফেটে যাচ্ছে, তখন সে বুঝতে পারে জলের আসল মূল্য। ‘যেসব শ্রমজীবীমানুষেরা রোদে পুড়ে আমাদের জন্য কাজ করে, তাদের কাছে একফোঁটা জলের দাম কতটা গভীর।’
সে চোখ নামিয়ে চুপচাপ মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে — আর নয়। কোনো কল খোলা দেখলে নিজেই বন্ধ করবে, আর কখনো জল অপচয় করবে না। নিজের ছেলেমানুষি ভুলগুলো স্বীকার করে নিয়ে নিঃশব্দে কেঁদে ফেলে সে।
ট্রেন গন্তব্যে পৌঁছায়। ট্রেন থেকে নেমে সে ছুটে যায় জল খাওয়ার উদ্দেশ্যে। চোখে-মুখে জল দেয় এবং একটু জল খায়। তারপর বালতি হাতে স্টেশনের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামে। দু'হাতে দুটো বালতি নিয়ে সে মিষ্টির দোকানের দিকে যাত্রা শুরু করে।
একটু হাঁটার পর সে দেখে, রাস্তায় কাদা জমে আছে। বোঝা যাচ্ছে না — রাস্তা পিচের, না মাটির। পরে জানতে পারে, ধান কাটার মরশুম চলায় ধান বোঝাই গাড়ি, ট্রাক্টর, হ্যাঙ ট্র্যাক্টরের যাতায়াতে এমন অবস্থা হয়েছে।
নিশির সেই কাদামাখা রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায়। কিছুদূর যাওয়ার পর তার হাতে প্রচণ্ড ব্যথা হতে থাকে। শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
মিষ্টির দোকানে ঢোকার আগেই নিশির কাঁদায় পিছলে পড়ে যায়। ছানার বালতি ছিটকে পড়ে যায় — সব ছানা মাটিতে মিশে যায়।
চারপাশ থেকে মানুষ ছুটে আসে। কেউ তাকে ধরে তোলে। একজন বৃদ্ধ আফসোস করে বলেন,
— “আহারে! কষ্ট করে ছানাটা নিয়ে এলো, সব গেল কাদায়।”
তার পাশ থেকে একজন বলে,
— “কেউ বলবে এটা পিচের রাস্তা! বিজ্ঞান আমাদের কাছে আশীর্বাদ না অভিশাপ?”
পাশ থেকে এক যুবক গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
— “বিজ্ঞান আমাদের জন্য আশীর্বাদ, কিন্তু মানুষের ভুল ব্যবহার আর অবিবেচনামূলক প্রয়োগের ফলে সেটাই হয়ে ওঠে অভিশাপ।”
এই কথা শুনে নিশির থমকে যায়। নিশির বুঝতে পারে, তার বাবা তাকে বেশি ফোন দেখতে মানা করেছিল তার ভালোর জন্যই। কিন্তু সে তখন বাবাকে ভুল বুঝেছিল।
একইসঙ্গে সে উপলব্ধি করে — জীবনের পথ কতটা কঠিন! শুধু খাওয়া-পরা নয় — সম্মান, কষ্ট, শিক্ষা — সবকিছুই জীবনে দরকার। বাবা যা বলেন, তা রাগ নয়, বরং অভিজ্ঞতার চিৎকার।
বাবার প্রতি জমে থাকা সব রাগ, সব অভিমান নিমেষেই ফুরিয়ে যায়। সে বুঝতে পারে — বাবা তার ভালোর জন্যই রাত-দিন পরিশ্রম করে, অথচ সে বাবাকে ভুল বুঝেছিল। বাবার মুখের ওপর তর্ক করেছিল, এমনকি অপমানও করেছিল।
এইসব ভেবে নিজেই নিজেকে দোষী মনে করে। নিজেকে নিজেই ধিক্কার জানায়। আর মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে — কোনোদিন আর বাবা-মাকে অপমান করবে না।
বাড়ি ফেরার ট্রেনে উঠে সে যখন স্টেশনে নামে, তখন সূর্য ঢলে পড়েছে। ফেরার পথে পড়ে একটি ঘন বাঁশঝাড়। সাইকেল চালিয়ে কিছুটা এগোতেই সে ঢুকে পড়ে সেই নির্জন বাঁশতলার রাস্তায়।
কিছুদূর যেতেই হঠাৎ সামনে একটি কালো বিড়াল রাস্তা কেটে একদিক থেকে অন্যদিকে চলে যায়। কুসংস্কারে থমকে দাঁড়ায় নিশির। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর সাহস সঞ্চয় করে জোরে সাইকেল চালিয়ে বাঁশতলা পার হওয়ার চেষ্টা করে।
কিন্তু কিছুতে যাওয়ার পরেই নিশিরের সাইকেলের চেন ছিঁড়ে যায়।
নিশির যখন ভাবছে, কীভাবে বাড়ি ফিরবে, তখন হঠাৎ দেখতে পায় — দূরে একটি সাদা কাপড় উড়ছে, আর তার সামনে দাঁড়িয়ে সেই কালো বিড়াল। বাতাস ভারী হয়ে ওঠে, চারপাশ যেন কেঁপে উঠছে। মনে হচ্ছে ভূমিকম্প হচ্ছে। হঠাৎ কেউ যেন কান ধরে টানছে তাকে।
— “বাবু! বাবু!”
দেখে — সেই কালো বিড়ালের মুখটা ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে তার বাবার মুখে।
চোখ খুলে দেখে — সত্যিই তার বাবা কান ধরে বলছেন,
— “ফোন দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়েছিস! সারাদিন শুধু ফোন, পড়াশোনা নেই তোর?”
নিশির জড়িয়ে ধরে বাবাকে। কাঁদতে কাঁদতে বলে,
— “বাবা, আমি বুঝেছি... এবার আমি সত্যি বদলাবো।”
তার মনে তখন একটি কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হয় —
“জীবনের অর্থ কীভাবে বুঝবে সে, যে চিরকাল থেকেছে বাবার ছায়ায়?
ছায়ার আরামে থাকা মানুষ কি কখনও রোদের তীব্রতা বোঝে?
জীবনের মানে জানতে হলে — একবার ছায়া ছেড়ে বেরোতে হয়।”
সেই মুহূর্তে বাবার প্রতি ভালোবাসা যেন চোখের জলে ভেসে ওঠে। হৃদয়ের গভীরে নরম সুরে গুনগুনিয়ে বাজতে থাকে কিছু কথা —
---
‘‘বাবা, আজ করেছি মনে,
একটি পণ গোপনে গোপনে।
তোমায় আমি দিব না হানী,
শ্রদ্ধা থাকবে চিরকাল জানি।
লাঞ্ছনা নয়, অপমান নয়,
তোমার নামে কলঙ্ক সয়।
নত শিরে তোমার পায়,
এমন কিছু করব না হায়।
তোমার মুখোমুখি তর্কে,
যাব না আমি কোন পর্বে।
পিতার বাণী শিরে রাখি,
অবাধ্য হব না, এই রাখি।
যা বলো তুমি, শুনবো সব,
তোমার কথাই আমার রব।
উঠিতে বললে উঠবো আমি,
বসিতে বললে বসবো ভ্রমি।
পিতা, তুমি যাহা বলো,
আমার তরে সত্য ছলো।
তোমার কথায় আছে আলো,
সে আলোয় জ্বলে প্রাণ ভালো।
তোমার ছোঁয়াতেই পাই সে আলো,
ভগবানের পথ হয় নিরালো।
তোমার ছোঁয়ায় পাই যে আশিস,
তাতেই মেলে জীবনের বিশ্বাস।
যতদিন থাকি এই ভূমে,
একটি কথা রাখি মনেমনে—
পিতা ধর্ম, পিতা কর্ম,
পিতা চিন্তায় জাগে নর্ম।
পিতা ছাড়া আমি শূন্য প্রাণ,
ছাদহীন এক মরু-বসান।
তুমি ছাড়া নাই যে ছায়া,
পিতার ভালোবাসা মহামায়া।
হে নারায়ণ, করো দয়া,
পিতারে রেখো সদা প্রয়া।
শত আঘাতে ভাঙে না মন,
থাকুক ঘরে ছায়ার ধন।
তার ছায়াতল চাই সারাক্ষণ,
বঞ্চিত হই না সেই অনুক্ষণ।
দিনরাত খেটে গড়েছো ঘর,
নিজের নয় — সংসার জয়।
কথা দিলাম তোমায় আমি,
তোমার বুকে যে ব্যথা জমি—
পরিশ্রম সব যাবে না বৃথা,
মেটাবো আমি কর্মের পথা।
তোমাকে আঘাত দিয়েছে যারা,
তাদের আমি করব না হারা।
ক্ষতি নয়, দিই শিক্ষা হেথা,
প্রতিশোধ নয়, আনব পথা।
তোমার শিক্ষা হৃদয়ে রাখি,
ভুলব না তা, যত দিন থাকি।
তোমায় যারা ঠেলেছে আঁধারে,
আমি দেবো শিক্ষা ঠিক সময়ে।
পিতা, তোমার সৌন্দর্য গভীর,
গোলাপের রঙও তাতে নিঃশব্দ ধবির।
তোমার কোমল হৃদয়ছায়া,
চাঁদের আলোয় হার মানায় মায়া।
তোমার মন সেই স্বচ্ছ জল,
যেথায় মিথ্যে কদাপি নয় চল।
সত্য, স্নেহ আর আশীর্বাদে,
তুমি বাঁচো হৃদয়-স্মৃতির স্রোতভাঁজে।
যতদিন আমার কবিতা থাকবে বেঁচে,
তুমি থাকবে আমার কবিতার মধ্যে বেঁচে।
প্রতিটি শব্দে, প্রতিটি তালে,
তোমার স্পর্শ থাকুক চিরকাল বাঙালির মনে।’’
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন