প্রেম, কি শুধু?
প্রহসন:- প্রেম, কি শুধু?
লেখক:- সোহন ঘোষ।
চরিত্রসমূহ:
আনির – এক সাদাসিধে তরুণ কবি। যে সমাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কবিতার মাধ্যমে প্রতিবাদ জানাই। মানুষের মধ্যে মানবতার আলো জাগিয়ে তোলে।
কাকা —
এক বাস্তববাদী পুরুষ, যিনি প্রেমের গভীরতা ও বাস্তবতা জানেন। তার অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ আনি’র জন্য দিকনির্দেশক, যদিও তিনি অনেক সময় তার মনোভাবের সঙ্গে সংঘর্ষে পড়ে যান।
----
দৃশ্য ১: কাকার বসার ঘর
সময়: সন্ধ্যা। ঘরে কাকার আরামকেদারা, পাশে চায়ের কাপ রাখা। আনির হাতে খাতা।
(আনির কাকাকে খাতা এগিয়ে দেয়। কাকা মন দিয়ে পড়েন।)
কাকা (চোখ সরু করে, একটু মুচকি হেসে):
আরে ভাইপো, তোর কবিতা পড়ে ভালোই লাগল। তবে সবসময় এই সমাজ, বিদ্রোহ, নৈতিকতা, মানবিকতা এসব নিয়ে পড়ে থাকলে হবে ? একটাও প্রেমের কবিতা নেই তোর খাতায়! প্রেম নিয়ে কিছু লিখ না?
আনির (হতভম্ব মুখে):
কাকা... প্রেম মানে কী?
কাকা (হাসতে হাসতে):
ওরে রে পাগল! প্রেম মানে বুঝিস না?
প্রেম মানে... যাকে তুই ভালবাসিস।
আনির (গম্ভীর মুখে মাথা নেড়ে):
ঠিক আছে, কাকা... লিখে আনছি।
(আলো ম্লান হয়।)
---
দৃশ্য ২: পরদিন সকাল
আবহ: পাখির ডাক, সকালের রোদ। আনির আবার খাতা নিয়ে হাজির।
আনির:
কাকা, আমি প্রেম নিয়ে কবিতা লিখে এনেছি।
কাকা (আনন্দের সাথে):
তাই নাকি, ভাইপো!
(আনির গর্বিতভাবে খাতাটা কাকার দিকে বাড়িয়ে দেয়।)
কাকা:
আমি খাতা দেখব না। তুই কবিতা বল আমি শুনবো।
আমি তোর কণ্ঠে তোর প্রেমের কথা শুনবো।
যাকে তুই ভালোবাসিস, তার কথা তোর কণ্ঠে শুনবো।
আনির (আনন্দের সাথে):
ঠিক আছে, কাকা!
(আনির নিজের খাতা চোখের সামনে ধরে পড়তে যাবে। সেই সময় কাকা বাধা দিয়ে বলে—)
কাকা (হাসির ছলে):
তা ভাইপো, তোর এই প্রেমের কবিতার নাম কী?
আনির (আনন্দের সাথে):
আমার এই কবিতার নাম—
"তোমার ছায়ায় কবিতা লিখি"।
(কাকা উঠে দাঁড়িয়ে ভাইপোর কাঁধে হাত রাখে।)
কাকা (মুখে হাসি নিয়ে রসিকতা করে):
বা, ভাইপো! আমি তো নামটা শুনেই চমকে গেলাম!
তাহলে কবিতা শুনলে আমার কী হবে?
(আনির পড়তে শুরু করে)
---
আনির ( অনির বিভিন্ন কন্ঠে বিভিন্ন ভঙ্গিতে পড়তে শুরু করে।):-
বাড়ির সম্মুখে শান্ত পুকুর,
জলে যেন রৌদ্রের নৃত্য।
আলো-ছায়ার খেলাঘরে
বুনে চলে মুগ্ধ চিত্র।
পাশে দাঁড়ায় বট ও তেতুল,
উঁচু শিরে তাল-নারকোল।
বটবৃক্ষে পাখিরা গায়—
বসন্তের ছোঁয়ায় গীতিময় অনুল।
নীরব ডালে ছানারা জাগে,
ডাকে কোকিল, জাগায় মন।
পাখিদের কণ্ঠে মধুর গুঞ্জন—
ঘুম নামে চোখে, বসে থাকি যদি ছাদে।
আছে পাশে ফুলের গাছে,
পল্লব কাঁপে হাওয়ার বাঁকে।
অলি আসে মধুর লোভে—
ওড়ে বেড়ায় নানা ঢঙে।
পুকুর জলে ঢেউয়ের ছন্দ,
হাওয়ায় বয়ে বয়ে বেজে ওঠে বন্দ।
সব মিলিয়ে সুরের মায়া—
প্রকৃতি গায় শান্তির গান।
পুকুরের ওপারে, দিগন্তে ছড়িয়ে পড়ে
একটি মাঠ, বিস্তৃত প্রান্তর।
যদি না দেখো—না বুঝিবে সেই কথা,
কী অপার শান্তি, কী নীরব ব্যথা—
লুকায় যেন সহজ স্বপ্ন-ছায়া।
ছাদে বসে চেয়ে থাকি,
নীরব দৃশ্য প্রাণে আঁকি।
গ্রীষ্মরাত্রির জোছনায়,
ছাদে উঠে জলের পাশে—
হাওয়ার ছন্দে, ঢেউয়ের ভাষায়—
চোখ বুজে আসে ঘুমের পাশে।
প্রকৃতির মাঝে কবিতা লিখি,
সবুজ পাতায় স্বপ্ন আঁকি।
আমি ভাবি শব্দ, তারাই দেয় ছন্দ—
হাওয়ার স্পর্শে, জোছনার চোখে—
তাদেরেই নিয়ে গড়ি মহাকাব্য।
---
কাকা (অবাক হয়ে):
এইটা আবার কী রে!
আমি তোকে প্রেম লিখতে বলেছিলাম,
তুই গিয়ে গাছ-গাছালি নিয়ে এলি?
আনির (গর্বিতভাবে):
কাকা, আমি প্রকৃতিকেই ভালোবাসি। যাকে...
কাকা (চেঁচিয়ে, কথা কেটে):
চুপ কর, পাগল!
আমি নারীর প্রতি প্রেমের কথা বলছিলাম রে! যার জন্য সবকিছু ত্যাগ করতে পারিস! আমি তার কথা বলেছি। আর তুই গিয়ে পাতা-ফুল নিয়ে এলি!প্রেম মানে তুলসী গাছ নয়, বাবা!
(আলো কমে যায়।)
---
দৃশ্য ৩: দুপুর বেলা।
আবহ: ঘরে একটু গরম হাওয়া, কাকার কপালে ঘাম। আনির আবার খাতা হাতে ঢোকে।
আনির:
এই নিন, কাকা! এবার লিখেছি একজন নারীকে নিয়ে প্রেমের কবিতা।
কাকা (উৎসাহ নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে):
তাই নাকি?
তা সেই নারীর নাম কী?
আনির (একটু শ্বাস নিয়ে, বুক ফুলিয়ে):
ভারত মা!
কাকা (চোখে বিরক্তি):
এ্যাঁ! তোকে আমি নারী-প্রেমের কথা বললাম,
আর তুই ভারত মাকে নিয়ে চলে এলি?
এই ছেলে প্রেম মানে বুঝে না !
(এবার একটু রেগে)
ওরে পাগল! আমি তোকে রক্ত-মাংসে গড়া নারীর কথা বলেছি!
যাকে ছোঁয়া যায়, যে সব সময় তোর পাশে থাকে! যাকে তুই নিজের জীবনের থেকেও ভালোবাসিস!
যার নাম, তোর হৃদয়ে লেখা।
যার সাথে, জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত বাঁধা।
(অনির কিছুক্ষণ মাথায় হাত দিয়ে ভাবার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকে)
আনির (শান্ত স্বরে):
আছে কাকা, তেমন একজন আছেন।
কাকা (স্বস্তি পেয়ে):
ওহ্! তাহলে এবার ঠিক প্রেম আসবে!
যাও, গিয়ে তাকে নিয়ে কবিতা লিখে আনো।
(আলো নিভে যায়।)
---
দৃশ্য ৪: বিকেল
আবহ: হালকা বাতাস। আনির এক হাতে খাতা, অন্য হাতে জয়ন্তী ফুল। চোখে উচ্ছ্বাস।
আনির (অত্যন্ত আনন্দের সাথে):
কাকা! এবার লিখে ফেলেছি!
কাকা (বুক ভরে):
বল দেখি, শুনি।
(আনির আবেগভরা কণ্ঠে পড়তে শুরু করে)
আনির:
মা আমার কাছে ভগবানের সমান,
মাকে করি তাই হৃদয়-পূজা।
মা না থাকলে পৃথিবী লাগে শূন্য,
মা পাশে থাকলে ব্যথা যায় নিমিষে বিয়োন।
মায়ের ছোঁয়ায় জেগে ওঠে শান্তি,
তার কথায় মেলে স্নেহভরা ভক্তি।
মায়ের মমতা যায় না মাপা—
তার সৌন্দর্যে হার মানে ফুলের রূপ।
তার দীপ্তিতে ম্লান হয়ে যায় রবি,
মায়ের ভালোবাসা—নিঃস্বার্থ, নিরবধি।
মা-ই হন আঁধারে সাহসের সূর্য,
দুঃখের রাতেও জ্বালান আশার প্রদীপ।
জ্বর হলে মা থাকেন পাশে,
জাগেন রাতভর আমার আশে-পাশে।
জননী মাগো, তুমি আমার দেবতা—
তোমার মতো স্নেহ কোথায় যাবে পাওয়া?
কে দেবে এমন নির্মল প্রেম?
তোমার তুলনা নেই, তুলনাটাই এক ভ্রম।
তুমি প্রাণের স্পন্দন,
তুমি জীবনের আলো।
ভালোবাসার উৎস তুমি—
হৃদয়-গভীরে জ্বলন্ত দীপ্তালো।
মা না থাকলে এই দুনিয়ায়,
সুশিক্ষা দেবে কে শুদ্ধ হৃদয় নিয়ে?
কে বাসবে ভালো নিঃস্বার্থ ছায়ায়?
---
(আনির কথা শেষ হওয়ার আগেই)
কাকা (চেঁচিয়ে উঠে):
চুপ কর!
আনির (হতবাক):
কেন, কাকা? ভালো হয়নি?
কাকা (রেগে গিয়ে):
তোর মাথায় কিছু ঢোকে না!
তোকে আমি প্রেমিকার জন্য কবিতা লিখতে বললাম—
তুই আবার মাকে নিয়ে কবিতা লিখে নিয়ে এলি!
আনির (গর্বিতভাবে):
কাকা, আমি তো মাকেই ভালোবাসি।
কাকা:
ওরে অবোধ! প্রেম হয় প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যে!
তুই কি কিছুই বুঝিস না?
আনির (অবাক চোখে কাকার দিকে তাকিয়ে):
কাকা, তুমি যে বললে প্রেম মানে ভালোবাসা।
কাকা:
হ্যাঁ রে অবোধ, প্রেম মানে ভালোবাসা।
যেটা তোর মধ্যে নেই।
আনির:
কিন্তু কাকা, প্রেম কি শুধু প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ?
যাদের জন্য আমাদের হৃদয়ে টান জাগে নীরবে—
সেটাই তো প্রেম।
প্রেম তো সবার মধ্যেই হতে পারে—
ছেলে-মেয়ে, মা-সন্তান, বন্ধু-বান্ধব, পশু-পাখি, কিংবা প্রকৃতির সঙ্গে।
যেখানে অনুভব, সেখানেই তো প্রেম।
কাকা (চুলচেরা রেগে):
তুই একটা বদ্ধ পাগল!
তোর কিচ্ছু হবে না!
(রেগে গিয়ে মঞ্চ ছেড়ে বেরিয়ে যান।)
আনির (ধীরে ধীরে দর্শকের দিকে ঘুরে, নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে):
“প্রেম কি শুধু প্রেমিক-প্রেমিকার মাঝেই সীমাবদ্ধ?
যেখানে হৃদয়ের টান, সেখানেই তো প্রেমের জন্ম।
মায়ের চোখের জলেও যেমন প্রেম থাকে,
তেমনি গন্ধহীন হাওয়াতেও লুকিয়ে থাকে ভালোবাসা।
প্রেম তো অনুভবের নাম—
রক্ত-মাংসের গণ্ডি পেরিয়ে সে ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র।”
(আলো নিভে যায়। পর্দা নামে।)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন